এক পরিবারের আট দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর অসহায়ত্বের করুণ গল্প

ছবি সংগ্রহীত
সবুজে ঘেরা নিভৃত এক গ্রাম উজিরাবো। গ্রামটির অবস্থান গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলায়। এর প্রাকৃিতক সৌন্দর্য মুগ্ধ করে সবাইকে। ছবির মতো সুন্দর এই গ্রামটিতে রয়েছে এক কষ্টের গল্প। জন্ম থেকে চোখে দেখেনি এই গ্রামেরই এক পরিবারের আটজন মানুষ। বাবাহীন এই পরিবারের সবকিছু চলে মা মোসাম্মদ রাশিদাকে ঘিরে। তার চার ছেলে-মেয়ের সবাই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। জন্মের পর থেকেই পৃথিবীর আলো থেকে বঞ্চিত তারা।

প্রশ্ন জাগতেই পারে, এমন কি হলো যার কারণে পরপর চার সন্তান জন্মান্ধ! এর উত্তর জানা নেই মা রাশিদার। সে নিজেই ভেবে পায় না, কি কারণে তার চার সন্তানদের এই দশা। একটি সুস্থ সন্তানের আশায় তিনি জন্ম দেন পরপর চার জন্মান্ধ শিশুর। রাশিদা ও তার স্বামীর পরিবারের কারও এমন কোনো সমস্যা ছিল না। তাহলে সৃষ্টিকর্তা কেন তাকে দৃষ্টিহীন এই চার সন্তান দিলেন? শুধু যে তার চার সন্তানই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী তা কিন্তু নয়। রাশিদার ছেলে-মেয়েদের ঘরেও জন্ম নিয়েছে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সন্তান। তাদের সবাইকে মিলে এই পরিবারের আটজন, সুন্দর এই পৃথিবীকে দেখার আশীর্বাদ থেকে বঞ্চিত।

মা রাশিদা তার সন্তানদেরকে জন্মের পর থেকে আজ অবধি দেখাশোনা করেই যাচ্ছে। কিন্তু তার বয়স হয়ে যাচ্ছে। আগের মতো সন্তানদের দেখাশোনা করা, তার জন্য দিনকে দিন কষ্ট হয়ে পড়ছে। তার ওপর নাতি-নাততিরাও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় কাজের বোঝা যেন বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। তারপরও শত কষ্টের মাঝে তার ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনিদের আগলে রেখেছেন তিনি। কিন্তু তার মনে ভয়, আর কতদিন তিনি আগলে রাখতে পারবেন? সময় বয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকেও ছেড়ে যেতে হবে এই পৃথিবী। তখন কে তার পরিবারের এই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের দেখে রাখবে? রাতদিন এই চিন্তাই পোড়ায় তাকে।

রাশিদার চার সন্তানের মধ্যে সবার বড় আমির। জন্মের পর থেকেই তার আঁধারের সঙ্গে বসবাস। আমিরের এক ছেলে। তার নাম ইমন, কিন্তু সে তার বাবার মতো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নয়। আমিরের স্ত্রী শিউলী, স্বামীর মতো দুই চোখ অন্ধ না হলেও এক চোখে সে দেখতে পায় না। একই সঙ্গে তার একটি হাতও অচল। এই তিনজনকে নিয়েই আমিরের সংসার। আমির অন্ধ হলেও সে ঢোল বাজিয়ে ও প্রতিবন্ধী ভাতা থেকে যা পায় তা দিয়ে কোনোমতে দিন চলে। পাশাপাশি এই সামান্য আয় দিয়ে চলে তার ছোট ভাই ও মায়ের জীবনও। চমৎকার ঢোল বাজাতে ও গান গাইতে পারে আমির। আমিরের বড় চাচা ঢোল বাজিয়ে গান করত।

ছোটবেলা থেকেই বড় চাচার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে গান ও ঢোল বাজানো শেখে সে। চোখে না দেখতে পারার কারণে তাকে ঢুলী হিসেবে গানের দলে কেউ নিতে চায় না। কারণ, আমিরকে নিলে তাকে সাহায্যের জন্য আরেকজন লোক লাগে। তাছাড়াও তার ঢোল মেরামতের দরকার। গানের মাঝে ঢোল নষ্ট হয়ে গেলে পুরো গান মাটি হয়ে যেতে পারে। এটিও একটি কারণ তাকে গানের দলে না নেওয়ার। করোনার পর থেকে তার আয় আরও কমে গেছে, আগে যেখানে সে দলের সঙ্গে থেকে একহাজার টাকা পেত, সেখানে এখন পায় মাত্র তিন শ’ থেকে চার শ’ টাকা। এই সামান্য আয় আর ভাতা দিয়ে অনেক কষ্টে চলে তাদের সংসার। কখনও কখনও না খেয়ে থাকতে হয় তাকে আর তার পরিবারকে।

আমিরের বড় বোন হাসিনা, সেও একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। হাসিনার চার সন্তানের মধ্যে দুই জন সুস্থ আর বাকি দুইজন মায়ের মতোই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। মা রাশিদা হাসিনাকে বিয়ে দিয়েছেন তারই ভাইয়ের ছেলের সঙ্গে যে রাজমিস্ত্রীর কাজ করে এবং সুস্থ। হাসিনা ঘরের কাজ করতে পারে ঠিকঠাক মতোই তবুও কিছু কিছু কাজ যেমন মাছ কাটা তার জন্য কষ্টসাধ্য। এইসব কাজে সে সাহায্য নেয় তার মায়ের। হাসিনার বোন নাসরিনের বিয়ে হয়েছে বাড়ির কাছেই। তার স্বামী শারীরিক প্রতিবন্ধী এবং সে চাকরি করে যা আয় করে, সেই টাকা দিয়ে চলে তাদের। নাসরিনের এক ছেলের চোখে অপারেশন করা হয়েছে, এখন সে দেখতে পায়। তার বোনের মতোই ঘরের কাজ করতে পারে নাসরিন, কিন্তু তারও সাহায্যের প্রয়োজন হয়। এজন্যই রাশিদা তার দুই মেয়েকে বাড়ির কাছে বিয়ে দিয়েছেন, যাতে তিনি সুযোগ পেলেই তার মেয়েদেরকে সাহায্য করতে পারেন।

রাশিদার সবার ছোট ছেলের নাম জাকির। জাকির পড়াশোনা করতে পারেনি অন্ধত্বের কারণে এবং সে কোনো কাজ করতে পারে না। তার এক মেয়ে আছে, নাম জোনাকি। জোনাকিও চোখে দেখতে পায় না। ছয় মাস বয়সী জোনাকিকে তার মা ছেড়ে চলে যায় শুধুমাত্র অন্ধ হয়ে জন্মানোর জন্য। জোনাকি মাদরাসায় পড়ে এবং হুজুরের মুখে শুনে সে পড়া শেখে। সুন্দর গজল গাইতে পারে জোনাকি!

ইন্সপিরেশন ওয়েলফেয়ার সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ও ‘হাত বাড়িয়ে দিলাম’ এর ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর সৈয়দা মুনিরা ইসলাম এই পরিবারের সন্ধান পেয়ে দেখা করতে যান তাদের বাড়িতে। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে চান তাদের কষ্টের কথা। তাদের কথায় বারবার উঠে আসে সরকারি ভাতা বাড়ানো আর নিজেরা স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার জন্য সাহায্যের আবেদন। এরপর সৈয়দা মুনিরা ইসলাম আরটিভি ও ইন্সপিরেশন ওয়েলফেয়ার সোসাইটির পক্ষ থেকে, এই পরিবারকে দুইটি ছাগল উপহার দেন, যাতে তারা তা পালন করে কিছুটা হলেও স্বাবলম্বী হতে পারে। একই সঙ্গে আমিরকে দেওয়া হয় আড়াই হাজার টাকা, যেন সে তার ঢোলটি ঠিক করতে পারে। ইন্সপিরেশন ওয়েলফেয়ার সোসাইটি ভবিষ্যতে এই পরিবারটির পাশে থাকার আশা প্রকাশ করেন।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এই মানুষগুলোকে শুধু অর্থাভাবেই কষ্ট করতে হয় তা নয়। তাদের চলাফেরার জন্য নেই উপযুক্ত কোনো রাস্তা। এই পাড়াগাঁয়ে নেই তাদের জন্য বিশেষ পদ্ধতি ব্রেইলের মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ। নেই উপযুক্ত প্রশিক্ষণের সুযোগও। অন্ধ হওয়ায় পাড়া প্রতিবেশীদের কাছেও তাদের শুনতে হয় নানা ধরনের কথা। মেম্বার, চেয়ারম্যানদেরও দেখা যায় না ভোটের সময় ছাড়া। সরকার ও সমাজ যদি তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে, তাহলে তাদের জীবনের পথ চলা কিছুটা হলেও সহজ হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *